ইতিহাসের আলোকে জমিয়ত উলামা ই হিন্দ ।
ইতিহাসের আলোকে জমিয়ত উলামা ই হিন্দ ।
-----মুহাম্মাদ শামসুদ্দোহা কাসেমী ।
উম্মাহ টাইমস্, বিশেষ প্রতিবেদন:
সম্প্রতি দিল্লির রামলীলা ময়দানে জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের ৩৪ তম সর্বভারতীয় অধিবেশন সম্পন্ন হলো। লক্ষ লক্ষ মানুষের উপস্থিতিতে রামলীলা ময়দান জনসমুদ্রে পরিণত হলো। বহু বরেণ্য ব্যক্তিবর্গের জ্ঞানগর্ভ বক্তব্য শুনে মানুষ বিমোহিত হলো। দেশ ও জাতির অগ্রগতির স্বার্থে অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত এখান থেকে ঘোষণা করা হলো। সোশ্যাল মিডিয়ার বদৌলতে সে খবর এখন ভুবনগ্রামের অধিবাসীদের অগোচরে নয়।
জমিয়তে উলামায়ে হিন্দ হলো ভারতের মুসলিমদের সর্ববৃহৎ প্রাচীন ইসলামী সংগঠন। ভারতবাসীদের মাথার উপরের ছাদ। এটি তৈরি হয়েছিলো আজ থেকে ১০৪ বছর পূর্বে। ১৯১৯ সালে। মাওলানা আব্দুল বারী ফিরিঙ্গি মহল্লি রহ., মুফতী কেফায়েতউল্লাহ দেহলবী রহ. ও মাওলানা আহমাদ সাঈদ দেহলভী রহ.প্রমুখ ব্যক্তিবর্গ এটি প্রতিষ্ঠা করেন। লক্ষ্য ছিলো ভারতকে ব্রিটিশদের হাত থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত করা। ভারতবাসীদের স্বাধীনভাবে মাথা উঁচু করে এখানে বসবাস করার পূর্ণ অধিকার দেওয়া। বর্তমানে এর সদস্য সংখ্যা এক কোটি কুড়ি লক্ষ। লক্ষ লক্ষ মানুষ এর অনুগামী।
ভারতের কৃতি সন্তানদের নিয়ে গঠিত এই বলিষ্ঠ সংগঠনের সদর দপ্তর নতুন দিল্লির বাহাদুর শাহ জাফর মার্গে। এর দাপ্তরিক ভাষা উর্দু ও ইংরেজি। শীর্ষ নেতৃত্বে আছেন স্বাধীনতা সংগ্রামী আলেম শাইখুল ইসলাম হযরত মাওলানা হুসাইন আহমাদ মাদানী রহ.এঁর সুযোগ্য সন্তান হযরত মাওলানা আরশাদ মাদানী সাহেব ও তাঁর ভাইপো হযরত মাওলানা মাহমুদ মাদানী সাহেব। তাঁদের উভয়ের বক্তব্যে আজ সোশ্যাল মিডিয়া বেশ সরগরম।
মাহমুদ মাদানী সাহেব সিংহপুরুষের মতো বলেছেন,*এই ভারত যতটা নরেন্দ্র মোদীর, যতটা মোহন ভাগবতের ঠিক ততটাই মাহমুদ মাদানীর।*
দারুল উলূম দেওবন্দের প্রধান শিক্ষক হযরত মাওলানা আরশাদ মাদানী সাহেব বজ্রনাদের মতো বলেছেন, *ভারতের আদি ধর্ম হলো ইসলাম। আদি মানব আদম আ.কে মহান আল্লাহ তা'আলা এই ভারতেই প্রেরণ করেন। তিনি মানবজাতির আদি পিতা। আমরা সবাই তাঁর বংশধর। তাঁকে হিন্দুরা বলেন মনু। তিনি এক আল্লাহ তা'য়ালার ইবাদত করতেন। যাঁকে হিন্দুরা বলেন ওম। তাহলে আমরা কেন আবার ঘরে ফিরবো? আমরা তো ঘরেই আছি। যাঁরা আমাদেরকে ঘরে ফিরতে বলছেন তাঁরা আসলে ইতিহাস সম্পর্কে অজ্ঞ।*
বিভিন্ন ধর্মের শীর্ষ নেতৃবৃন্দের সামনে তিনি এই কথাটি খুব বলিষ্ঠভাবে তুলে ধরেন।
শায়খুল হিন্দ, ভারতের মুক্তি সংগ্রামের জন্য মাল্টার জেলে বন্দি হযরত মাওলানা মাহমুদ হাসান দেওবন্দী রহ.,শাইখুল ইসলাম হযরত মাওলানা হুসাইন আহমাদ মাদানী রহ., স্বাধীন ভারতের প্রথম শিক্ষা মন্ত্রী হযরত মাওলানা আবুল কালাম আজাদ রহ.দের মতো ভারতরত্নদের হাতে লালিত এই সংগঠন ভারতকে স্বাধীন করার জন্য জাতীয় কংগ্রেসের সাথে জোটবদ্ধ হয়ে খেলাফত আন্দোলনে অংশগ্রহণ করে। ভারত বিভাজনের বিরোধিতা করে সকল ভারতীয়কে একই জাতি স্বীকৃতি দিয়ে সম্মিলিত জাতীয়তাবাদের পক্ষে অবস্থান গ্রহণ করে।
স্বাধীনতা সংগ্রামী এই ঐতিহাসিক সংগঠন সারা ভারতে তার শাখা বিস্তার সহ জাতীয় উন্মুক্ত বিদ্যালয়, জমিয়তে উলামায়ে হিন্দ হালাল ট্রাস্ট, লিগাল সেল ইনস্টিটিউট, জমিয়ত যুব ক্লাবের মতো বহু গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান গঠন করে। সর্বদা দেশ ও জাতির সেবা প্রদান করে দেশবাসীর পাশে থাকে। সদ্ভাবনা মঞ্চ তৈরি করে দেশবাসীর মধ্যে সম্প্রীতি ও সৌহার্দের বাতাবরণ তৈরি করে। সকল ভারতবাসীকে সমান চোখে দেখে।
স্বাধীনোত্তর কালে মুসলিম-অমুসলিম, ভারতে একটি পারস্পরিক চুক্তিতে আবদ্ধ হয় ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য। ভারতের সংবিধান এই চুক্তির প্রতিনিধিত্ব করে।
১৯২০ সালে এই সংগঠন বিলেতি পণ্য বর্জনের ফতোয়া জারি করে। পরবর্তীতে ১৯৪২ সালে ভারত ছাড়ো আন্দোলনে অংশগ্রহণ করে। আইন অমান্য আন্দোলন শুরু করে। সংগঠনের হাজার হাজার কর্মীরা ঘন ঘন গ্রেফতারি ও কারাজীবন বরণ করেন। দেশ ও দেশবাসীর মুক্তির জন্য ফাঁসির কাষ্ঠে হাসিমুখে প্রাণ বিসর্জন দেন। শাহাদাতের তাজা খুনে ভারতের মাটিকে পবিত্র করেন।
সে এক দীর্ঘ ইতিহাস!
রক্তাক্ত ইতিহাস!
চেপে রাখা ইতিহাস!
নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর ভাইপো শিশির কুমার বোস তাই বলেছিলেন, *জমিয়ত না থাকলে ভারতের স্বাধীনতা ১০০ বছর পিছিয়ে যেত।*
আজ আফসোস! দেশের জন্য যাঁরা টনটন রক্ত দিলেন, দ্বীপান্তরের নির্বাসিত জীবন কাটিয়ে জেলখানায় মৃত্যুবরণ করলেন, দেশবাসীর মুখে হাসি ফোটানোর জন্য জীবনের সব রকমের আরাম ত্যাগ করলেন, স্ত্রীদের বিধবা করলেন, সন্তানদের এতিম করলেন তাঁদেরকে দেশপ্রেমের পরীক্ষা দিতে হচ্ছে!
এটা স্বাধীনতা সংগ্রামীদের প্রতি চরম অসম্মান!
জগত সভায় পৃথিবীর বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশের জন্য চরম লজ্জা!
সাম্প্রদায়িক শক্তির উগ্র বহিঃপ্রকাশ!
আলোকিত ভারতের জন্য অশনি সংকেত!
মহান আল্লাহ তা'আলা শতবর্ষ প্রাচীন এই স্বাধীনতা সংগ্রামী সংগঠনকে ভারতবাসীর জন্য কম্পাস বানিয়ে দিন। তার সঠিক দিকনির্দেশনায় সকলকে চলার তৌফিক দিন। এর সাথে সংশ্লিষ্ট সকলকে উত্তম বিনিময় প্রদান করুন। মাটির উপরে ও নিচে। আমীন।
মুহাম্মাদ শামসুদ্দোহা কাসেমী
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন