মুহাররম: শরীয়তের আলোকে করণীয় ও বর্জনীয়।

মুহাররম: শরীয়তের আলোকে করণীয় ও বর্জনীয়।
মুহাররম: শরীয়তের আলোকে করণীয় ও বর্জনীয়।

মুহাররম মাস আগত হলেই এক নিদারুণ কাহিনী আমাদেরকে নাড়া দিয়ে যায়। মনে পড়ে যায় ইসলামের ইতিহাসের এক হৃদয় বিদারক ঘটনা। অত্যাচারী শাসক কর্তৃক রচিত বনু উমাইয়ার এক কলঙ্কময় অধ্যায়। জালিমের জুলুমের এক ঘৃণিত নিদর্শন। "নওয়াসায়ে রসূল" -এঁর নির্মম হত্যাকাণ্ড। সম্মানীয় আহলে বাইতকে অপমানের এক যোজনা।
   এসব ঘটনাবলি শোনার বা জানার পর সকলেরই  নয়ন অশ্রুসিক্ত হয়ে যায়। ঝরতে থাকে তপ্ত অশ্রুধারা। একটা অব্যক্ত যন্ত্রণা বুকের ভিতর মোচড় দিয়ে ওঠে। রসূলের প্রতি, তাঁর আহলে বাইতের প্রতি, তাঁর কলিজার টুকরো হজরত হুসাইন (রাঃ) -এঁর প্রতি নতুন ভাবে যেন ভালোবাসা জাগ্রত হয়। অন্তরে ঈমানী চেতনার অনুভবও পরিলক্ষিত হয়। দ্বীনের জন্য সেই অত্যাচারিত ব্যক্তিটির আত্মত্যাগ ও আত্মবলিদানের কথা স্মরণে আসলে শ্রদ্ধায় মাথা অবনমিত হয়ে যায়। কেন হবে না! তিনি যে "নওয়াসায়ে রসূল!" তিনি যে "সাহাবায়ে রাসূল!" তিনি যে অন্যায়ের সাথে আপোষহীন এক নাম। তিনি যে অত্যাচারীর বিরুদ্ধে গর্জে ওঠা এক ব‍্যক্তিত্ব। তিনিই সেই ব্যক্তিত্ব যাকে সারা দুনিয়া হজরত হুসাইন (রাঃ) নামে চেনে। তাঁর প্রতি সম্মান, শ্রদ্ধা, ভক্তি ও ভালোবাসাও ঈমানের অঙ্গ, ইসলামের দাবি।

   কিন্তু ইসলামী শরীয়াতে "মহরম" কি তাঁর জন্য আলাদা কোনও বৈশিষ্ট ধারণ করে? বা ইসলাম এই মাসকে বা আশুরার দিনকে তার শাহাদাতের কারণে কি এমন শোকের মাস হিসাবে চিহ্নিত করে, যে শোকের বহিঃপ্রকাশ ঢাকঢোল পিটিয়ে, ব্লেড বা ছুরি দিয়ে নিজেকে রক্তাক্ত করে, তলোয়ার বা লাঠি খেলার প্রদর্শনী করে, জাঁকজমকপূর্ণ তাজিয়াসহ মিছিলের মাধ্যমে করা হয়ে থাকে!? চলুন আজ এর উত্তর খোঁজা যাক।

   প্রথমেই জেনে নেওয়া উচিত যে,
শোকপ্রকাশের নামে বা হজরত হুসাইন (রাঃ) -এঁর প্রতি ভালোবাসার নামে যা কিছু করা হয় সেগুলো কোনও সুস্থ মস্তিষ্ক সম্পন্ন মানুষের কাজ হতে পারে না, এবং ইসলামী শরীয়তের সাথে এগুলি মোটেই খাপ খায় না। ব্যাপারটা এতই স্পষ্ট যে, এর প্রমাণাদি পেশ করারও কোনও হেতু নেই।

   কিন্তু অতীব দুঃখের বিষয় যে, মুহাররম সম্পর্কে সঠিক ধারণা না থাকার কারণে এসব অপসংস্কৃতিতে মুসলিম সমাজের এক বড়ো অংশ সরাসরি অংশগ্রহণ না করলেও এর মাধ্যমে বিনোদিত হয়। অনেকে আবার ধর্মের অংশও ভাবতে শুরু করে।

কুরআন ও হাদীসের আলোকে মুহাররমের গুরুত্ব বা ফজীলত সম্পর্কে যা কিছু বর্ণিত হয়েছে, সেটাই মুসলমানদের মান্য করা উচিত। উক্ত প্রেক্ষিতে হজরত হুসাইন (রাঃ) এঁর আশুরার দিনে (১০-ই মুহাররম) শাহাদাতের ঘটনা একটি ঘটনাক্রম। আশুরার দিনেই সেটা সংগঠিত হওয়াকে কাকতালীয়ও বলা যেতে পারে।
অথচ আশুরা বা "মহরম" বলতে আমরা এটাকেই বুঝি। তবে হ্যাঁ, এই দিনে তিনি শাহাদাত পেয়েছিলেন। তার জন্য সকল নবীপ্রেমী ও সাহাবাপ্রেমীদের হৃদয় অবশ্যই ব্যথিত হয়। কিন্তু তাঁর শাহাদাতের ঘটনাটাই মুহাররম বা আশুরার উৎস নয়। এবং তাঁর শাহাদাতকে কেন্দ্র করে এমন শোকপ্রকাশও বাঞ্ছনীয় নয়। এমনিতেই শরীয়াতে কারোর মৃত্যুর পরে তিনদিনের বেশি শোকপালন বৈধ নয়। (তবে স্ত্রী, স্বামীর জন্য চার মাস দশদিন (ইদ্দতের সময়কাল) পর্যন্ত শোকপালন করতে পারে। স্ত্রীর স্বামীর জন্য শোকপালন বলতে, সাজসজ্জা না করা, অযথা বাড়ির বাইরে না যাওয়া, ইত্যাদি ইত্যাদি। অর্থাৎ এক কথায় যেটাকে একজন সুস্থ প্রকৃতির মানুষ শোকপালন বলে মনে করে।) আহলে বাইত বা নবী পাক (সাঃ) -এঁর পরিবারের সদস্যের এমন নির্মম হত্যাকাণ্ডের জন্য যদি শোকপ্রকাশ করা বাধ্যতামূলক জ্ঞান করা হয়, তাহলে হজরত হামজা (রাঃ) তো তার বেশি অধিকারী। তিনিও তো আহলে বাইত ছিলেন। আর যদি নৃশংসতার ভিত্তিতে এমন শোকপ্রকাশ করা হয়ে থাকে তাহলে এটাও মনে রাখা উচিত যে, শাহাদাতের পরে হজরত হামজা (রাঃ) -এঁর কলিজা বার করে চিবানো হয়েছিল। নাক, কান কেটে নিয়ে চেহারা বিকৃত করে দেওয়া হয়েছিল। অথচ হজরত হামজা (রাঃ) -এঁর শাহাদাত নিয়ে একটা শব্দও খরচ করা হয় না! সত্যি বলতে কি, আহলে বাইতের শাহাদাত নিয়ে শোকপালন করার চেতনা লালনকারীদের বেশিরভাগই হয়ত এটা জানেও না।

   দ্বীনের মূল সূত্র হল, কুরআন, হাদীস এবং তা প্রসূত ইজমা ও কিয়াস। (উল্লেখ্য যে, শেষের দুটি কুরআন ও হাদীস থেকে আলাদা কোনও বিষয় নয়। বরং কুরআন বা হাদীস থেকে কোনও বিষয়ের বিধি বিধান যদি সরাসরি অনুমিত না পাওয়া যায়, তখন উক্ত গ্রন্থদ্বয় থেকে উদ্ভূত নীতিমালার আলোকে সেটা অন্বেষণ ও উদ্ভাবন করার নামই হল কিয়াস। আর এমন উদ্ভাবন দক্ষতার অধিকারী সমসাময়িক ওলামাদের সর্বসম্মতিক্রমে কোনও বিধান মান্যতা পেলে তার নাম ইজমা। এবং অতি অবশ্যই ইজমা ও কিয়াস গ্রহণীয় হওয়ার কিছু শর্তাবলী আছে যা এখানে আলোচনা করা সম্ভব নয়।)
এই চতুষ্টয়ের আওতার বাইরের কোনও বিষয়কে ধর্মের রূপ দিতে চাওয়া নিতান্তই অনৈসলামিক ব্যাপার বলে গণ্য হবে। ইসলামের সাথে এমন বিষয়সমূহের বিন্দুবিসর্গও সম্পর্ক নেই। নবী (সঃ) বলেন,
  مَنْ أَحْدَثَ فِي أَمْرِنَا هَذَا مَا لَيْسَ فِيهِ فَهُوَ رَدٌّ.
" দ্বীন বহির্ভূত কোনও বিষয় কেউ যদি দ্বীনের ভিতরে প্রবেশ করাতে চায় তবে তা কোনও মতেই গ্রহণীয় নয়।" (বুখারী, হাদীস নং - ২৬৯৭)

   মুহাররমের বিষয়ে এক শ্রেণির কার্যকলাপ দেখলে মনে হবে যেন ঈদের মতো এটা বিশেষ কোনও উৎসব। আবার অন্য এক শ্রেণির কাছে এটা শোকদিবস। দুই শ্রেণির কারোরই কাছে মুহাররম সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা নেই। মুহাররম বা আশুরা কি? কি-ই বা তার প্রেক্ষাপট? কোথা থেকে তার উৎপত্তি? এসব প্রশ্নের উত্তরে শেষোক্ত শ্রেণির কাছে কারবালার মর্মান্তিক ঘটনা ছাড়া আর কিছুই স্পষ্ট নয়। আর প্রথম শ্রেণি ঠিক কি কারণে একে অপরকে ওয়াটসঅ‍্যাপ বা ম‍্যাসেঞ্জারে "হ‍্যাপি মুহাররম" লিখে উইশ করে সেটা আমার কাছে ঠিক স্পষ্ট নয়। এবং আমার দৃঢ় বিশ্বাস তাদের কাছেও বিষয়টি স্পষ্ট নয়। তবে হ্যাঁ, ইয়াহুদিরা যদি এই দিনটিকে আনন্দের সাথে উদযাপন করে, উৎসব আকারে পালন করে তার হেতু বলা যেতে পারে। কেননা ইমাম বুখারীর বর্ণনা থেকে জানা যায়, এই দিনে হজরত মুসা (আঃ) ও তাঁর কওম বানী ইসরাঈল ফিরআউনের হাত থেকে নিস্তার পেয়েছিলেন। যে কারণে হুজুর (সঃ) -এঁর যুগে ইয়াহুদীরা এই দিনে শুকরিয়া স্বরূপ রোজা রাখত। যুগের প্রেক্ষিতে তারা রোজা রাখা ছেড়ে দিয়ে "হ‍্যাপি মুহাররম" লিখতেই পারে! একে অপরকে উইশ করতেই পারে! কিন্তু মুসলিমরা কি কারণে করবে?

    অথচ হুজুর পাক (সঃ) এঁর তিরোধানের সাথে সাথে ইসলামী শরীয়াতের প্রধান দুই সূত্র কুরআন ও হাদীসও পূর্ণতা লাভ করেছে। সেখানে আর কোনও রদবদলের অবকাশ নেই। এই বিষয়ে কোনও ইজমা বা কিয়াসের প্রয়োজনও প্রশ্নাতীত। নবী পাক (সঃ) -এঁর ওফাত ১১ হিজরীতে আর হজরত হুসাইন (রাঃ) এঁর শাহাদাতের ঘটনা সংগঠিত হয়েছে ৬১ হিজরীতে। সেকারণে ভাবতেও আশ্চর্য লাগে যে, ইসলামী শরীয়াহ পূর্ণ হবার ৫০ বছর পরের কোনও ঘটনাকে শরীয়তের অংশ মনে করা হচ্ছে।

   এখন প্রশ্ন হতে পারে, তাহলে মুহাররম বা আশুরা কি? তার প্রেক্ষাপট কি? কুরআন বা হাদীসে এর কোনও ফজীলত বা কোনও বর্ণনা আছে কি?

এই প্রসঙ্গে পবিত্র কুরআনের একটি আয়াত এখানে উদ্ধৃত হল,
"إن عدة الشهور عند الله اثنا عشر شهرا فى كتب الله يوم خلق السموت والارض منها اربعة حرم ذلك الدين القيم فلا تظلموا فيهن انفسكم."

অর্থ : "নিশ্চয়ই আল্লাহর বিধান ও গণনায় মাস বারটি, আসমানসমূহ ও পৃথিবী সৃষ্টির দিন থেকে। তন্মধ্যে চারটি সম্মানিত। এটিই সুপ্রতিষ্ঠিত বিধান; সুতরাং এর মধ্যে তোমরা নিজেদের প্রতি অত্যাচার করো না।" ( সূরা তওবা : আয়াত ৩৬)

  এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বুখারী শরীফে হজরত আবু বাকরা (রাঃ)  থেকে একটি হাদীস বর্ণিত আছে।

السَّنَةُ اثْنَا عَشَرَ شَهْرًا. مِنْهَا أَرْبَعَةٌ حُرُمٌ ؛ ثَلَاثٌ مُتَوَالِيَاتٌ، ذُو الْقَعْدَةِ، وَذُو الْحِجَّةِ، وَالْمُحَرَّمُ، وَرَجَبُ مُضَرَ الَّذِي بَيْنَ جُمَادَى وَشَعْبَانَ.

   অর্থ : “সম্মানীয় মাসসমূহের মধ্যে তিনটি হল ধারাবাহিক, অর্থাৎ পরস্পর মিলিত; যিলক্বদ, যিলহজ্জ ও মুহাররম। আর চতুর্থটি হলো মুজ-র গোত্রের রজব মাস; যা জুমাদাল উখরা ও শা’বান মাসের মাঝখানে অবস্থিত।” (বুখারী শরীফ, হাদীস নম্বর: ৪৬৬২, তাফসীর অধ‍্যায়, সূরা তাওবা।)

   হাদীসপাকের মধ্যেও মুহাররমের ফজীলত বর্ণিত হয়েছে।
হজরত আবু হুরায়রা (রাঃ) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সঃ) ইরশাদ করেছেন, রমজানের রোজার পর সর্বাধিক ফজিলতপূর্ণ রোজা হল, মুহাররমের রোজা। (মুসলিম শরীফ, ১/৩৬৮, হাদীস নং : ১৯৮২)

  তাঁর থেকে আরও বর্ণিত, বরকতপূর্ণ মুহাররমের রোজাটি মূলত দশই মুহাররম অর্থাৎ আশুরার রোজা। স্বয়ং রসূল (সঃ) এই দিনে রোজা রেখেছিলেন এবং সাহাবাদেরকেও রোজা রাখার আদেশ করেছিলেন।

   হজরত হাফসা (রাঃ) বর্ণনা করেন, "চারটি আমল এমন যা নবী (সঃ) কখনই ছাড়তেন না। আশুরার রোজা, জিলহজ্জ মাসের ৯ তারিখের রোজা, প্রতিমাসের তিনটি রোজা, ফজরের পূর্বে দুই রাকাত নামাজ।" (মুসনাদে আহমাদ, ২/৪)

  রসূল (সঃ) আরও বলেন, "আশুরার রোজার ব্যাপারে আমি আল্লাহর কাছে আশাবাদী যে তিনি এর দ্বারা বিগত এক বছরের গোনাহ মাফ করে দেবেন।" (মুসলিম শরীফ, ১/৩৬৭)

    ইসলামে আশুরার রোজার সূচনা কিভাবে হল?  এ সম্পর্কে সর্বাধিক প্রসিদ্ধ মত  হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রসূল (সঃ) মদীনায় আসার পর লক্ষ্য করলেন যে, ইয়াহুদীরা এইদিনে রোজা রাখে। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, এটা কিসের রোজা? তারা বলল, এটি একটি শুভদিন। এই দিনে আল্লাহ তা'আলা বানী ইসরাঈলকে তাদের শত্রুর কবল থেকে পরিত্রাণ দিয়েছিলেন। তাই মূসা (আঃ) এই দিনে রোজা রেখেছিলেন। তখন নবী (সঃ) বললেন, মূসা (আঃ) -এঁর অনুসরণের আমি তোমাদের থেকে বেশি হকদার। তারপর তিনি নিজে রোজা রাখতেন এবং সাহাবাগণকেও রোজা রাখতে নির্দেশ দিতেন। (বুখারি, হাদিস নং: ২০০৪, মুসলিম ১/৩৫৯, হাদিস নং : ২৬৫৮)

     হজরত আয়েশা (রাঃ) আশুরা বা মুহাররমের রোজার একটি কারণ বর্ণনা করেন যে, জাহেলিয়াতের যুগে কুরাইশরা আশুরার দিনে রোজা রাখত এবং রসূল (সঃ) ও রোজা রাখতেন। মদীনায় আসার পর তিনি নিজেও রোজা রাখলেন এবং মুসলমানদেরকেও রোজা রাখার আদেশ দিলেন। রমজান মাসের রোজা ফরজ হওয়ার পর ইরশাদ করলেন, (#এখন_থেকে_আশুরার_রোজা_ঐচ্ছিক_বিষয়।) যার ইচ্ছা সে রাখবে আর যার ইচ্ছা সে ছেড়ে দেবে। (আবু দাউদ হাদীস নং : ২৪৪২, বুখারী : ১/২৬৮, মুসলিম : ১/৩৫৭)

    কুরাইশদের এই দিনে রোজা রাখার বিষয়ে প্রখ্যাত হাদীস বিশারদ হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানী লিখেছেন, এ সম্পর্কে হজরত ইকরিমাকে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, জাহেলিয়াতের যুগে কুরাইশরা একটা বড় গুনাহ করে ফেলেছিল, তা মোচনের উদ্দেশ্যে এই দিনে তারা সমবেত ভাবে রোজা রাখত।

   এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে যে, আশুরার সুন্নাত রোজা দুটি। যদিও হুজুর পাক (সঃ) একটি রোজা রেখেছেন। দুটি রোজা সুন্নত হওয়ার কারণ হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস বর্ণনা করেন যে, যখন রসূল (সঃ) আশুরার রোজা রাখলেন এবং সাহাবীগণকে রোজা রাখার আদেশ দিলেন, তখন তারা বললেন, "ইয়া রসূলাল্লাহ! ইয়াহুদীরা তো এই দিনটাকে খুব সম্মানের সাথে পালন করে!" প্রত‍্যুত্তরে নবী (সঃ) বলেন, "আগামী বছর বেঁচে থাকলে নয় তারিখেও রোজা রাখব।" (মুসলিম, হাদীস নং : ১১৩৪)

    উপরোল্লিখিত হাদীসগুলি সূত্রগত দিক দিয়ে খুবই মজবুত। আশুরা বা মুহাররমের বিষয়ে আরও কিছু বর্ণনা বিভিন্ন হাদীসগ্রন্থে পাওয়া যায়। যেমন তাবরানী শরীফের ঈমান অধ্যায়ের একটি হাদীসে এই দিনে নিজের পরিবারবর্গকে ভালো খাওয়াতে ও ভালো পরিধান করাতে উৎসাহিত করা হয়েছে। কোনও বর্ণনায় অসহায় ইয়াতীমদের প্রতি সহানুভুতি প্রকাশ করার কথা বলা হয়েছে। ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু এই হাদিসগুলি সনদ বা সূত্রগত দিক দিয়ে কিছুটা দুর্বল। তবে ফজীলতের ব্যাপারে এমন হাদীসের উপর আমল করা যেতেই পারে।

    এছাড়াও এই দিনেই বিভিন্ন নবীদের সাথে সম্পৃক্ত তাদের জীবনের যে সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাবলি ঘটার কথা উল্লেখ করা হয়, - যেমন - হজরত আদম (আঃ) এঁর তওবা কবুল। হজরত নূহ (আঃ) এঁর নৌকা থেকে উত্তরণ। হজরত ইব্রাহিম (আঃ) এঁর নমরুদের অগ্নিকুণ্ড থেকে পরিত্রাণ। দীর্ঘ বিচ্ছেদের পর হজরত ইউসুফ (আঃ) এঁর তার পিতার সাথে সাক্ষাৎ। হজরত ইউনুস (আঃ) এর মাছের পেট থেকে বার হয়ে আসা। ইত্যাদি ইত্যাদি।- সেগুলো তেমন নির্ভরযোগ্য কোনও সূত্র থেকে প্রমাণিত নয়।

    মোটকথা আশুরা বা মুহাররমের ব্যাপারে কুরআন হাদীসে যা কিছু পাওয়া যায়, উপরের বর্ণনাগুলো তারই মোটামুটি নির্যাস। এর বাইরে গিয়ে যদি আশুরা বা মুহাররম পালন করতে চাওয়া হয় তবে তা নিশ্চিত ভাবে ইসলামী শরীয়তের আলোকে হবে না বরং তা শরীয়তের সাথে সাংঘর্ষিকই হবে।

   এক শ্রেণির মতে আশুরার রোজার কারণ নাকি হজরত হুসাইনের শাহাদাত বরণ! তাঁর এই শাহাদাতকে স্মরণীয় করে রাখার জন্য নাকি আশুরার রোজা রাখা হয়!
কত অন্তঃসারশূন্য কথা! হুজুর পাক (সঃ) এঁর ওফাতের ৫০ বছর পরে ঘটা কোনও ঘটনাকে শরীআতের একটি বিধানের উৎস ধরে নেওয়া হচ্ছে!

   সারকথা এই যে, যারা নিজেদেরকে মুসলিম মনে করেন এবং গর্বের সাথে নিজেকে মুসলিম পরিচয় দিয়ে থাকেন, অবশ্যম্ভাবী ভাবে ধর্মীয় ব্যাপারে তাদের গাইডবুক কুরআন ও হাদীসই হতে হবে। এই দ্বয়ের আলোকেই একজন মুসলিমের ধর্মীয় জীবনদর্শন গড়ে ওঠা উচিত। কোনটা করণীয় কোনটা বর্জনীয় সেগুলোও এই দুই -এর কষ্টিপাথরেই যাচাই করে নিতে হবে। মুহাররম বা আশুরা কেন্দ্রিক আমাদের সমাজে যা কিছু প্রচলিত আছে, (এই লেখার শুরুর দিকে যেগুলি আমি উল্লেখ করেছি)  কুরআন হাদীসের আলোকে সেগুলি অতি অবশ্যই বর্জনীয়। এবং কী করণীয় এই লেখার পাঠান্তে আশা করি সকলেই তা বুঝতে পেরেছেন।

লেখক:

মুফতি মনজুর আলম কাসেমী

সম্পাদক আল কাসিম(বাংলাভাষী ছাত্রদের মুখপত্র, দেওবন্দ)

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

ফিদায়ে মিল্লাত হজরত মাওলানা আসআদ মাদানী স্মরণে।

উদয়পুরের ঘটনা অত্যন্ত দুঃখজনক ও নিন্দনীয় : জমিয়ত উলামা।

উঠল চলতি বছরে হজের জন্য নির্ধারিত বয়সের ঊর্ধ্বসীমা । খুুুশির খবর চলতি বছরে হজ গমনেচ্ছুদের জন্য।

বিষ্ণুপুর আমরা করবো জয় এর উদ্যোগে রক্তদান শিবির।

‘ইউনিফর্ম সিভিল কোড’ আইন ঠেকাতে জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের ৫ সিদ্ধান্ত।