দারুল উলুম দেওবন্দের সহ-উপাচার্য আব্দুল খালিক্ব সাম্ভলীর পূর্ণাঙ্গ জীবন।
দারুল উলুম দেওবন্দের সহ-উপাচার্য আব্দুল খালিক্ব সাম্ভলীর পূর্ণাঙ্গ জীবন।
আব্দুল খালেক সাম্ভলীর পূর্ণাঙ্গ জীবন
দারুল উলূম দেওবন্দের যে সকল মাশায়েখের দরস থেকে উপকৃত হয়েছি তাঁদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন দারুল উলূম দেওবন্দের নায়বে মুহতামিম, সম্মানিত শায়খ আল্লামা আব্দুল খালেক সাম্ভলী রহ.। তাঁর কাছ থেকে সিহাহ সিত্তার অন্যতম কিতাব ‘সহীহ ইবনে মাজাহ’-এর দরস ও ইজাযত লাভ করার সৌভাগ্য হয়েছিল। সহজ-সরল ভাষায় হাদীসের ব্যাখ্যা, প্রাণঞ্জল ভাষায় পাঠ উপস্থাপন, রসাত্মক কাহিনির মাধ্যমে দরসেগাহকে আনন্দমুখর করা এবং উর্দূ ও ফার্সি কবিতার মাধ্যমে বক্তব্যকে শ্রুতিমধুর করে তোলা, সর্বোপরি আকাবিরের স্মৃতিচারণের মাধ্যমে জটিল বিষয়কে সহজলভ্য করে তোলার ক্ষেত্রে অন্যন্য ব্যক্তিত্ব ছিলেন আল্লাম আব্দুল খালেক সাম্ভলী রহ.।
দেওবন্দ থেকে আসার পর হযরতের কথা অনেক মনে পড়তো। কিন্তু যোগাযোগের সুযোগ ছিলো না। ২০২০ সালে আল-জামিয়া আল-ইসলামিয়া পটিয়ার আন্তর্জাতিক ইসলামী মহাসম্মেলনে তিনি তাশরীফ আনেন। হযরতের খেদমতের যিম্মাদারী ছিলো অধমের উপর। নিকটে থেকে সুহবত-সংশ্রবে সময় কাটানোর সৌভাগ্য হয়েছিল। জামিয়ায় এসে তিনি অনেক মুগ্ধ হয়েছিলেন। অধমকে অনেক পরামর্শ ও দুআ দিয়েছিলেন। যাওয়ার সময় প্রাইভেট নম্বরটি দিয়েছিলেন এবং হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর দিয়ে যোগাযোগ করার সুযোগ করে দিয়ে ছিলেন। আল্লাহ তাঁকে উত্তম প্রতিদান দান করেন, আমীন।
কিছুদিন পূর্বে সংবাদ পেলাম শায়খ অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। আল্লাহর দরবারে অনেক দুআ করা হলো। পরে শুনলাম, তিনি কিছুটা সুস্থতাবোধ করছেন। আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া জানালাম। কিন্তু গত কয়েকদিন পূর্বে জানতে পারলাম, তিনি আবারো অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। আহ! পরিশেষে আজ (৩০/০৭/২০২১ খৃষ্টাব্দ মোতাবেক, ২০ই জিলহজ ১৪৪২ হিজরী, জুমাবার) সংবাদ পেলাম, তিনি আমাদেরকে এতীম করে চলেন গেলেন, ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।
হে আল্লাহ, আমাদের প্রিয় শায়খ তোমার মেহমান হয়েছেন। তুমি দয়া করে, তাঁকে জান্নাতুল ফিরদাউসের নায-নেয়ামত দ্বারা উন্নত মেহমানদারি করো। তিনি সদা হাস্যোজ্জল থাকতেন, তাঁকে কবরে হাস্যোজ্জল রাখো।
নিম্নে হযরতের কিছু জীবন-কর্ম ও স্মৃতি আলোচনা করা হলো-
জন্ম ও বংশ পরিচিতি : আল্লামা আব্দুল খালেক সাম্ভলী রহ. ভারতের উত্তর প্রদেশের মুরাদাবাদ জেলার “সম্ভল” এলাকায় ৪ঠা জানুয়ারী ১৯৫০ খৃষ্টাব্দে এক সম্ভান্ত পরিবারে জন্মলাভ করেন। তাঁর পিতার নাম নসীর আহমদ। তাঁর পিতা একজন নম্র ও ভদ্র, সরল ও কোমল অন্তরের অধীকারি ব্যক্তি ছিলেন। তিনি সদা প্রফুল্ল ও সাদাসিদে জীবন-যাপনে অভ্যস্ত ছিলেন। তেমনি তিনি একজন সাহিত্যিক ও সুললিত কণ্ঠের অধিকারী কবিও ছিলেন।
পড়া-লেখা ও শিক্ষা-দিক্ষা : আল্লামা আব্দুল খালেক সাম্ভলী রহ. প্রাথমিক পড়াশুনা নিজ গ্রামের প্রতিষ্ঠান ‘খায়রুল মাদারিস’-এ আরম্ভ করেন। সেখানে তিনি মুফতি মুহাম্মদ আফতাব আলী রহ.-এর কাছ থেকে পাঠ গ্রহণ করতেন। কিছুদিন পর তাঁর শিক্ষক মুফতি মুহাম্মদ আফতাব আলী রহ. যখন শামসুল উলূম মাদরাসায় যোগদান করেন, তখন তিনিও সেখানে চলে যান। সেখানে তিনি হাফেজ ফরিদুদ্দিন সাহেবের নিকট হিফজ সমাপ্ত করেন এবং ফার্সি ও প্রাথমিক আরবী জামাত থেকে নিয়ে ‘শরহে জামি’ পর্যন্ত মুফতি মাহাম্মদ আফতাব রহ.-এর নিকটেই পড়েন।
অতঃপর ১৯৬৮ ইংরেজীতে তিনি দারুল উলূম দেওবন্দে ভর্তি হন। তিনি যেহেতু শিশুকাল থেকেই মেধাবী ও প্রতিভাবান ছিলেন, তাই দারুল উলূম দেওবন্দে এসে তাঁর মেধা আরো বিকাশিত হতে লাগলো। তিনি দারুল উলূমে পড়া-লেখায় তাঁর সাথীদের উপর এগিয়ে যেতে লাগলেন। প্রায় পাঁচ বছর যাবত তিনি দারুল উলূম দেওবন্দে অধ্যয়ন করেন। এই পাঁচ বছরের অধ্যয়নকালে তিনি তার সমস্ত সময় একাডেমিক পড়াশুনায় ব্যয় করতেন। নিয়মিত দরসে উপস্থিত থাকা, পড়া-লেখায় মনোনিবেশ করা, শিক্ষকমণ্ডলি ও ইলমের সরঞ্জামগুলির প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধা প্রদর্শন করা এবং সুশৃঙ্খলভাবে কার্জ সম্পাদন করা; ইত্যাদি ছিলো তাঁর প্রধান বৈশিষ্ট্য।
১৯৭২ খৃষ্টাব্দে দাওরায়ে হাদীস সমাপনী পরীক্ষায় তিনি তৃতীয় স্থান অধিকার করেন। অতঃপর তিনি আরবি সাহিত্যে দক্ষতা অর্জনের লক্ষ্যে দারুল উলূম দেওবন্দে ‘তাকমীলে আদব’-এ ভর্তি হন। সেখানে আল্লামা ওয়াহীদুযযামান কিরানভী রহ.-এর বিশেষ সান্নিধ্যে থেকে আরবি সাহিত্য অধ্যয়ন করেন। দারুল উলূম দেওবন্দের শীর্ষ শায়খগণের কাছ থেকে জ্ঞান অহরণ করেন। শায়খুল হিন্দ রহ.-এর প্রসিদ্ধ শিষ্য আল্লামা ফখরুদ্দীন মুরাদাবাদী রহ.-এর কাছ থেকে তিনি বোখারী শরীফ পড়ছেন। হাকীমুল ইসলাম আল্লামা কারী তৈয়ব রহ., মুফতি মাহমূদুল হাসান রহ., আল্লামা শরীফুল হাসান রহ. এবং আল্লামা নসীর আহমদ খান রহ. প্রমুখের কাছ থেকেও তিনি হাদীসের সনদ অর্জন করেন।
শিক্ষাকতা ও কর্মজীবন : ১৯৭৩ খৃষ্টাব্দ থেকে শিক্ষাকতার মাধ্যমে তাঁর কর্মজীবনের সূচনা হয়। তিনি সর্বপ্রথাম হাপুড়ের খাদেমুল ইসলাম মাদরাসায় সিনিয়র শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। সেখানে ছয় বছর পর্যন্ত সুনামের সাথে অধ্যাপনার কাজ চালিয়ে যান। অতঃপর ১৯৭৯ সালে মুরাদাবাদের জামিউল হুদা মাদরাসায় সিনিয়র শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। সেখানে তাঁর দরস-তাদরীসের সুনাম ছড়িয়ে পড়ে। তিন বছর যাবত সেখানে তিনি জ্ঞান বিতরণ করতে থাকেন।
অবশেষে ১৯৮২ সালে দারুল উলূম দেওবন্দে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ প্রাপ্ত হন। ১৯৮২ ইংরেজী থেকে মৃত্যু অবধি প্রায় ৩৯ বছর যাবত তিনি দারুল উলূম দেওবন্দের খাদেম ছিলেন।
দারুল উলূম দেওবন্দের অনেক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব তিনি পালন করেছেন। তিনি ছিলেন আমানতদারী ও সততার মূর্তপ্রতীক। অনেকদিন যাবত তিনি দারুল উলূম দেওবন্দের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক ছিলেন। পরিশেষে ২০০৮ সাল থেকে তিনি দারুল উলূম দেওবন্দের সহকারী পরিচালকের গুরু দায়িত্ব পালন করে আসছেন।
হায়! আজ (৩০/০৭/২০২১ খৃষ্টাব্দ মোতাবেক, ২০ই জিলহজ ১৪৪২ হিজরী, জুমাবার) আল্লাহর সান্নিধ্যে গমন করেন, ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। রাত ১১টায় দারুল উলূম দেওবন্দের ঐতিহাসিক ‘মূলসরী ময়দানে’ তাঁর নামাযে জানাযা শেষে ‘মাকবারায়ে কাসেমী’তে তাঁকে দাফন করা হয়। আল্লাহ তাঁর কবরকে রিয়াযুল জান্নাহ-এ পরিণত করেন, আমীন।
স্মৃতি ও স্মরণ : তিনি যেমন ছিলেন একজন দক্ষ শিক্ষক, তেমন ছিলেন একজন খুরদার লিখক। তাঁর বক্তব্য যেমনি ছিলো শ্রুতিমধুর, তেমনি তাঁর লিখনি ছিলো অনেক প্রবাহমান। ফতওয়ায়ে আলমগীরের কিছু খণ্ড তিনি উর্দূ ভাষায় অনুবাদ করেছেন। এছাড়াও তিনি মুখতাসারুল মাআনীসহ দরসে নেজামীর অনেক জটিল কিতাবের ব্যাখ্যাগ্রন্থও রচনা করেছেন।
তিনি ছাত্রদের প্রতি বিশেষ দৃষ্টি দিতেন। কোন ছাত্র কোন সমস্যা নিয়ে গিলে তাকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করতেন। তাঁর কাছ থেকে সকলেই উৎসাহ-উদ্দীপনা পেতেন। কেউ ছোট একটি রেসাল-পুস্তিকা নিয়ে গেলে তিনি তা পড়তেন। ভূমিকা ও অভিমত লিখে দিতেন। হযরতের অনেক স্মৃতি হৃদয়ে অক্ষুন্ন হয়ে আছে। সুযোগ হলে পরে লিখব, ইনশা আল্লাহ।
রব্বে কারীম!
দয়া করে আমাদের শায়খকে রহম করুন। তাঁর খেদমতগুলো কবুল করুন। দারুল উলূমের জন্য তাঁর উত্তম স্থলাভিষিক্ত দান করুন। তাঁর কবরকে জান্নাতে রূপান্তর করুন। জান্নাতুল ফিরদাউসের উচ্চু মাকাম দান করুন, আমীন।
লেখক :
সলিমুদ্দিন মাহদি কাসেমী
শিক্ষক, আল-জামিয়া আল-ইসলামিয়া পটিয়া, চট্টগ্রাম।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন